গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসী ঘাট। অপর পারে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট। মাঝখানে প্রবাহিত হচ্ছে প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই দুই পাড়ে নৌকায় পারাপার হয়। কৃষক তাদের উৎপাদিত ধান, গম, আলু নিয়ে আসেন বাজারে; ব্যবসায়ীরা যান পণ্য কিনতে; আবার অনেকেই চিকিৎসা কিংবা শিক্ষা–কাজে যাতায়াত করেন। কিন্তু নদী পারাপারে ভরসা নৌকা ও ফেরি। বর্ষাকালে স্রোত বেড়ে গেলে যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পাড়ি দেন। শুষ্ক মৌসুমে ফেরিঘাটে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় মানুষের দাবি—বালাসী ঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত একটি সেতু বা টানেল নির্মাণ। তাদের বিশ্বাস, এমন অবকাঠামো নির্মাণ হলে শুধু যাতায়াত সহজ হবে না, বরং উত্তরাঞ্চলের শিল্প, ব্যবসা এবং পর্যটনে আসবে বিপ্লব।
উত্তরবঙ্গকে বলা হয় দেশের শস্যভাণ্ডার। দিনাজপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় থেকে শুরু করে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম—সব জেলা কৃষিপণ্য উৎপাদনে অগ্রগণ্য। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজসহ নানান কৃষিপণ্য এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়।
কিন্তু পরিবহন ব্যয় ও সময় বেশি লাগায় কৃষক প্রায়ই ন্যায্যমূল্য পান না। উদাহরণস্বরূপ, দিনাজপুরের আলু ও ভুট্টা ঢাকায় পৌঁছাতে ট্রাক ভাড়া গুনতে হয় বেশি। আবার ফেরিঘাটে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে গিয়ে পচন ধরে পণ্যে। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সেতু হলে এই চিত্র বদলে যাবে। কৃষিপণ্য দ্রুত ঢাকায় ও চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারবে। কৃষি–প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। আলু থেকে চিপস, গম থেকে আটা, ভুট্টা থেকে কর্নফ্লেক্স তৈরি করা সম্ভব হবে স্থানীয় কারখানায়। রংপুর অঞ্চলের উদ্যোক্তারা মনে করেন, সেতু হলে শুধু কৃষিপণ্য নয়, নতুন নতুন কারখানা ও গুদাম তৈরি হবে, যা কর্মসংস্থানও বাড়াবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, “পদ্মা সেতু যেমন দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি বদলে দিয়েছে, এই সেতু হলে উত্তরাঞ্চলও পাল্টে যাবে।”
তার মতে, সেতু হলে ট্রাক–পিকআপে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। ঢাকায় যেতে সময় বাঁচবে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। পরিবহন খরচ কমলে ব্যবসায়ীরা পণ্য কম দামে বিক্রি করতে পারবেন। এর ফলে রাজধানীর বাজারেও উত্তরাঞ্চলের পণ্যের চাহিদা বাড়বে।
অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের মানুষ ব্যবসার জন্য ঢাকায় যাতায়াত করেন নিয়মিত। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রা অনেক সময় তাদের নিরুৎসাহিত করে। সেতু হলে নতুন বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবেন। গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও জোরদার হবে।
উত্তরাঞ্চল শুধু কৃষি নয়, পর্যটনের জন্যও সমৃদ্ধ। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের সবুজ চা বাগান, দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দির ও শস্যভাণ্ডার, রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের নদীকেন্দ্রিক পর্যটন—এসব স্থানে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক আসেন।
কিন্তু দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য যাত্রার কারণে অনেকেই ভ্রমণ থেকে বিরত থাকেন। সেতু হলে ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের পর্যটক সহজেই উত্তরাঞ্চলে আসতে পারবেন। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা আসিফ হোসেন বলেন, “সেতু হলে আমাদের হোটেল, রিসোর্ট আর পরিবহন ব্যবসা বাড়বে। অনেক তরুণ কাজের সুযোগ পাবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দেশি পর্যটক নয়, বিদেশি পর্যটকরাও উত্তরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য উপভোগে আগ্রহী হবেন। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু হলে উত্তরাঞ্চল সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হবে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের অনেক জেলা যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার কারণে পিছিয়ে আছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের জন্য যেমন “গেমচেঞ্জার” হয়েছে, তেমনি এই সেতু উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিতে পারে।
একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলেন, “উত্তরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে হলে বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু এখন সময়ের দাবি। শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়, নদীপথ ও রেল যোগাযোগও এই সেতুর মাধ্যমে উন্নত হবে।”
গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, “আমরা ধান–ভুট্টা উৎপাদন করি, কিন্তু ঢাকায় পাঠাতে গিয়ে ক্ষতিতে পড়ি। সেতু হলে আমাদের খরচ কমবে, লাভ হবে।”
জামালপুরের কলেজছাত্রী সাদিয়া আক্তার বলেন, “প্রতিদিন আমাদের যাতায়াতের ভোগান্তি। সেতু হলে পড়াশোনা, চাকরি বা চিকিৎসা—সবকিছুতেই সুবিধা হবে।”
অন্যদিকে পরিবহন ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম মনে করেন, সেতু হলে উত্তরাঞ্চলের ট্রাক–বাস ব্যবসা বাড়বে দ্বিগুণ।
সেতু নির্মাণে অবশ্যই বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। নদীর গভীরতা, প্রবল স্রোত, ভাঙন—এসব বিষয়ও প্রকৌশলীদের মাথায় রাখতে হবে। তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগ লাভজনক হবে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ও পর্যটন থেকে যে অর্থনৈতিক সুফল আসবে, তা কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যয় মেটাতে সক্ষম।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু বা টানেল শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি হবে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন ভিত্তি। শিল্প বাড়বে, ব্যবসা প্রসারিত হবে, পর্যটনে যুক্ত হবে নতুন রঙ। সবচেয়ে বড় কথা, উত্তরাঞ্চল সরাসরি যুক্ত হবে জাতীয় অর্থনীতির মূলস্রোতে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমানের কথায়, “এই সেতু শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, গোটা বাংলাদেশের উন্নয়নের সেতুবন্ধন হবে।”
বিশেষ প্রতিনিধি: 











