সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পলাশবাড়ীতে লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি ব্যবসা জমজমাট!

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন বাজারের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের সহস্রাধিক ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান।

ঔষধ প্রশাসনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অনেকেই ফার্মেসি দিয়ে বসেছেন ওষুধ বিক্রির ব্যবসায়। এসব ফার্মেসি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি করছে অবাধে। এ ছাড়া নেই কোনো প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট। ফলে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগীরা। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার-পরিজন।

পলাশবাড়ী উপজেলার ১ পৌরসভা ও ৮ টি ইউনিয়নের বাজারে গড়ে উঠেছে ফার্মাসিস্ট, প্রশিক্ষণ ছাড়া ও ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন শত শত ফার্মেসি। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন।

বিশেষ করে, কিশোরগাড়ী, হোসেনপুর, পবনাপুর, মনোহরপুর ও হরিনাথপুর ইউনিয়নে প্রত্যান্ত এলাকার শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, অন্তঃসত্ত্বারা উপজেলা সদরে ও রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে আসেন না।

তারা তাদের পার্শ্ববর্তী বাজারের ফার্মেসির শরণাপন্ন হয়ে রোগের বর্ণনা দিয়ে ওষুধ নেন। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে ফার্মেসিগুলো।

পলাশবাড়ী উপজেলা সদর,মেরিরহাট,কাশিয়াবাড়ী বাজার,বড় শিমুল তলা বাজার,ছোট শিমুলতলা বাজার,নয়া বাজার,বোর্ড বাজার,কাজির বাজার,হরিনাবাড়ী,মরাদাতেয়া বাজার,ফুটানির বাজার,আমলাগাছী বাজার,মাঠেরহাট,বুড়ির বাজার,জুনদহ বাজার এলাকায় ফার্মেসির ড্রাগ লাইসেন্স ও ফার্মাসিস্টের প্রশিক্ষণ নেই।

ফার্মেসিগুলো চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রায় এজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের বড়ি ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট, নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের নানা ধরনের ওষুধ অবাধে বিক্রি করে আসছে। ফলে একদিকে যেমন ওষুধ ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪০ অনুসারে কারও ওষুধের দোকান বা ফার্মেসি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে প্রথমেই কমপক্ষে ছয় মাসের ফার্মাসিস্ট কোর্স করে সনদ সংগ্রহ করতে হবে। পরে সংশ্নিষ্ট ড্রাগ সুপারের কার্যালয়ে ফার্মাসিস্ট সনদ জমা দিয়ে ড্রাগ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ৪ নম্বরের ১৩ নম্বর ধারায় ‘ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ’ শিরোনামে উলেল্গখ আছে, কোনো খুচরা বিক্রেতা বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের কোনো রেজিস্ট্রারের রেজিস্ট্রিভুক্ত ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধান ব্যতিরেকে কোনো ড্রাগ বিক্রি করতে পারবে না। কিন্তু এ নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ওষুধ বিক্রি হচ্ছে এসব ফার্মেসিতে।

কয়েকজন সচেতন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন ফার্মেসিতে আর বিশেষজ্ঞ লোকের দরকার হয় না। ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা বলে দেন কোন ওষুধ কী কাজে লাগে- সেই অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি হয়। এ ছাড়া অনেক ওষুধের দোকানে নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ওষুধ বিক্রি করে দেন। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে ভালোমানের ওষুধের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি কমিশন নেওয়া হচ্ছে। এতে বেশি লাভের আশায় ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা।

সাধারণ মানুষও কোন ওষুধটি আসল ও কোনটি ভেজাল তা চিহ্নিত করতে অপারগ। এর ফলে এ ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বাণিজ্য দিন দিন জমজমাট হচ্ছে। আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। উপজেলার অবৈধ ফার্মেসিগুলো সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বেশি মূল্যে বিক্রি করছে, যা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে উল্টো নানা উপসর্গের সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া অসচেতন রোগীদের চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে উল্লিখিত ওষুধের একই গ্রুপের নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করার অভিযোগও রয়েছে।

ওষুধ পরিদপ্তর থেকে বছরে দু একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলে ও আগেই ড্রাগ এন্ড কেমিস্ট সমিতিকে জানানো হয়।ফলে অভিযান পরিচালনার সময় সকল ফার্মেসি বন্ধ রাখা হয়।

পলাশবাড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান বলেন, ফার্মেসি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির সার্বক্ষণিক থাকা ও ফার্মেসির ড্রাগ লাইসেন্স থাকা প্রয়োজন। এসবের ব্যত্যয় ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

গাইবান্ধায় নবাগত ও বিদায়ী পুলিশ সুপারের সংবর্ধনা ও দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠান

পলাশবাড়ীতে লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি ব্যবসা জমজমাট!

Update Time : ০৭:৫২:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০২৪

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন বাজারের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের সহস্রাধিক ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান।

ঔষধ প্রশাসনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অনেকেই ফার্মেসি দিয়ে বসেছেন ওষুধ বিক্রির ব্যবসায়। এসব ফার্মেসি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি করছে অবাধে। এ ছাড়া নেই কোনো প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট। ফলে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগীরা। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার-পরিজন।

পলাশবাড়ী উপজেলার ১ পৌরসভা ও ৮ টি ইউনিয়নের বাজারে গড়ে উঠেছে ফার্মাসিস্ট, প্রশিক্ষণ ছাড়া ও ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন শত শত ফার্মেসি। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন।

বিশেষ করে, কিশোরগাড়ী, হোসেনপুর, পবনাপুর, মনোহরপুর ও হরিনাথপুর ইউনিয়নে প্রত্যান্ত এলাকার শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, অন্তঃসত্ত্বারা উপজেলা সদরে ও রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে আসেন না।

তারা তাদের পার্শ্ববর্তী বাজারের ফার্মেসির শরণাপন্ন হয়ে রোগের বর্ণনা দিয়ে ওষুধ নেন। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে ফার্মেসিগুলো।

পলাশবাড়ী উপজেলা সদর,মেরিরহাট,কাশিয়াবাড়ী বাজার,বড় শিমুল তলা বাজার,ছোট শিমুলতলা বাজার,নয়া বাজার,বোর্ড বাজার,কাজির বাজার,হরিনাবাড়ী,মরাদাতেয়া বাজার,ফুটানির বাজার,আমলাগাছী বাজার,মাঠেরহাট,বুড়ির বাজার,জুনদহ বাজার এলাকায় ফার্মেসির ড্রাগ লাইসেন্স ও ফার্মাসিস্টের প্রশিক্ষণ নেই।

ফার্মেসিগুলো চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রায় এজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের বড়ি ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট, নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের নানা ধরনের ওষুধ অবাধে বিক্রি করে আসছে। ফলে একদিকে যেমন ওষুধ ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪০ অনুসারে কারও ওষুধের দোকান বা ফার্মেসি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে প্রথমেই কমপক্ষে ছয় মাসের ফার্মাসিস্ট কোর্স করে সনদ সংগ্রহ করতে হবে। পরে সংশ্নিষ্ট ড্রাগ সুপারের কার্যালয়ে ফার্মাসিস্ট সনদ জমা দিয়ে ড্রাগ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ৪ নম্বরের ১৩ নম্বর ধারায় ‘ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ’ শিরোনামে উলেল্গখ আছে, কোনো খুচরা বিক্রেতা বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের কোনো রেজিস্ট্রারের রেজিস্ট্রিভুক্ত ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধান ব্যতিরেকে কোনো ড্রাগ বিক্রি করতে পারবে না। কিন্তু এ নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ওষুধ বিক্রি হচ্ছে এসব ফার্মেসিতে।

কয়েকজন সচেতন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন ফার্মেসিতে আর বিশেষজ্ঞ লোকের দরকার হয় না। ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা বলে দেন কোন ওষুধ কী কাজে লাগে- সেই অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি হয়। এ ছাড়া অনেক ওষুধের দোকানে নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ওষুধ বিক্রি করে দেন। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে ভালোমানের ওষুধের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি কমিশন নেওয়া হচ্ছে। এতে বেশি লাভের আশায় ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা।

সাধারণ মানুষও কোন ওষুধটি আসল ও কোনটি ভেজাল তা চিহ্নিত করতে অপারগ। এর ফলে এ ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বাণিজ্য দিন দিন জমজমাট হচ্ছে। আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। উপজেলার অবৈধ ফার্মেসিগুলো সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বেশি মূল্যে বিক্রি করছে, যা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে উল্টো নানা উপসর্গের সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া অসচেতন রোগীদের চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে উল্লিখিত ওষুধের একই গ্রুপের নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করার অভিযোগও রয়েছে।

ওষুধ পরিদপ্তর থেকে বছরে দু একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলে ও আগেই ড্রাগ এন্ড কেমিস্ট সমিতিকে জানানো হয়।ফলে অভিযান পরিচালনার সময় সকল ফার্মেসি বন্ধ রাখা হয়।

পলাশবাড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান বলেন, ফার্মেসি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির সার্বক্ষণিক থাকা ও ফার্মেসির ড্রাগ লাইসেন্স থাকা প্রয়োজন। এসবের ব্যত্যয় ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।