একজন মুজিবসেনার গল্প


দৈনিক বাংলাদেশ প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১৩, ২০২১, ২:১৮ পূর্বাহ্ণ / ২৮৩
একজন মুজিবসেনার গল্প

মরহুম জননেতা লুৎফর রহমান।বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন,বিশ্বস্থ সহযোদ্ধা। গাইবান্ধা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নিজ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সদর আসনের সাবেক এম,পি।জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ।বৃহত্তর রংপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি।

অনেক বছর আগের কথা ।গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদ কতৃক(মরহুম)মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ চৌধুরীর সভাপতিত্বে
‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা।

জননেতা লুৎফর রহমান এম,পি ডায়াসের সামনে দাঁড়ালেন।বক্তব্য নয়,স্মৃতিচারণ করছেন—-
“সেই ৫২ সালের কথা।বৃহত্তর রংপুর,দিনাজপুর অঞ্চলে তখন একটিমাত্র বি,এ কলেজ।রংপুর কারমাইকেল কলেজ।সেবার কারমাইকেল কলেজ হতে আমরা ২৮ জন বি,এ পাশ করলাম(সংখ্যাটা ১৮-ও হতে পারে,এইমুহূর্তে লিখতে ধরে ঠিক মনে করতে পারছি না)।
ফলপ্রকাশের পরপরই,আমি তখন গাইবান্ধায়।আত্মীয়-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশীরা আসে আমাকে দেখতে,একটু কথা বলতে,শুভেচ্ছা বিনিময় করতে।আমার বাসার নিকটেই অর্থাৎ পলাশপাড়া মোড়ে তখনকার দিনের খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ আব্দুস সোবহানের বাসা।আব্দুস সোবহানের বাসায় শেখ মুজিবর রহমান এসেছেন,তা আমি তখন পর্যন্ত জানতাম না।আব্দুস সোবহান শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলেন যে,তাঁর একজন প্রতিবেশী কারমাইকেল কলেজ থেকে বি,এ পাশ করেছে।নাম লুৎফর রহমান।শোনামাত্রই শেখ মুজিব বললেন,
“ওকে ডাকো।আমি ছেলেটার সাথে একটু কথা বলবো।”
আব্দুস সোবহান লোক মারফত আমাকে ডেকে পাঠালেন।
আমি যাওয়ার পর শেখ মুজিবর রহমানের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।তখন পর্যন্ত আমি শেখ মুজিবের নাম অসংখ্যবার শুনেছি।সেদিনই তাঁকে প্রথম দেখলাম।তিনি আমাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানালেন,এবং বললেন-
“লুৎফর,এই জাতির জন্য তোমাকে আমার প্রয়োজন।
তোমাকে রাজনীতি করতে হবে।”
শুনে আমি বললাম–
“মুজিব ভাই,রাজনীতি তো করে রায় বাহাদুর,খান বাহাদুর,
নবাব,নাইট,জমিদার,জোতদাররা।আমি দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান।আমি কিভাবে রাজনীতি করবো?”
শুনে শেখ মুজিব বললেন,
“লুৎফর,এই নবাব,নাইট,জোতদার,জমিদারদের হাত থেকে রাজনীতিকে ছিনিয়ে নিয়ে গনমানুষের হাতে রাজনীতিকে তুলে দেওয়াই হবে তোমার-আমার রাজনীতি।”
আমি বললাম,”মুজিব ভাই,আমাকে একটু সময় দিন।আমি ভেবে-চিন্তে আপনাকে জানাবো।”
তিনি বললেন,”ঠিক আছে,তুমি একটু ভেবে দেখ।ঢাকায় এসে আমার সাথে দেখা করো।”
এর কিছুদিন পর আমার কাছে সাব-রেজিষ্ট্রার পদে চাকুরীতে যোগদানের চিঠি এলো।আমি যোগদানপত্রটি সাথে নিয়ে ঢাকা গেলাম।সচিবালয়ের দিকে যাচ্ছি।গুলিস্তানে গোলাপশাহের মাযারের উল্টোপাশে ফুটপাত ধরে আমি হেঁটে যাচ্ছি।এমন সময় দেখি,একটি বাইসাইকেলের সামনে বসেছেন শেখ মুজিব,আর সাইকেল চালাচ্ছেন আওয়ামীলীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফা(তাঁকে আমি তখন চিনতাম না,পরে চিনেছি)।
আমাকে দেখেই শেখ মুজিব বললেন,”এই থামো থামো।তুমি লুৎফর না?”বলেই রাস্তা পার হয়ে আমার দিকে আসতে লাগলেন।আমিও একটু এগিয়ে গিয়ে তাঁকে সালাম দিয়ে বললাম,”জ্বি মুজিব ভাই,আমি লুৎফর।কিন্তু আমি অবাক হলাম যে,আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন!!”
শুনে তিনি বললেন,”তোমার মতো লুৎফরদেরকে যদি আমি না মনে রাখতে পারি,চিনতে না পারি,তাহলে তো আমার এই জাতির মুক্তিসংগ্রাম সফল হবে না।”বলেই তিনি জানতে চাইলেন,কবে এসেছি,কোথায় উঠেছি,কোন সমস্যা আছে কি-না,থাকলে যেন তাঁকে জানাই,তারপর কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইলেন।আমি তাঁকে আমার উদ্দেশ্য এবং গন্তব্য জানাতেই একটু যেন আশাহত হলেন আমাকে তাঁর পাশে আর পাচ্ছেন না বলে।তিনি আমাকে আর একটিবার ভাবতে বললেন।
আর বললেন,”পল্টনে জনসভা আছে।আর দেরী করা যাচ্ছে না।আমাকে এখনই যেতে হবে।তোমার হাতে তো আরও যথেষ্ট সময় আছে।চূড়ান্তভাবে আর একটিবার ভেবে দেখ লুৎফর।”

তিনি চলে গেলেন।আমি দাঁড়িয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখছি।
গাজী গোলাম মোস্তফা সাইকেল চালাচ্ছেন।আর সামনের রডে বসে আছেন শেখ মুজিবর রহমানের মতো একজন নেতা!!কেন যেন মনটা আমার ডেকে উঠলো!ভাবলাম,ইনিই একদিন অনেকবড় নেতা হবেন।এই জাতির মুক্তির জন্য শেখ মুজিবের মতো নেতাই দরকার।তাঁর মতো নেতার দ্বারাই এই জাতির মুক্তি আসবে।আর মুজিব ভাই যখন এতোকরে বলছেন,আমি আর চাকুরী করবো না।আমি রাজনীতিই করবো।

“সেই থেকে আমি মুজিবআদর্শের একজন সৈনিক হিসাবে গর্ববোধ করি।যদি আমি রাজনীতিতে না এসে সেদিন চাকুরীতেই যোগদান করতাম,তাহলে একজন সচিব হিসাবে অবসর নিতাম।আজ হয়তো অনেক সম্পদ,অর্থ-বিত্তের মালিক হতাম।কিন্তু শেখ মুজিবের সহযোদ্ধা হিসাবে শেখ মুজিবের বাংলাদেশে সর্বস্তরের মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি,তা এই পৃথিবীতে আর কোন যোগ্যতা দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।আপনারা বিশ্বাস করুন,আমি আজ তৃপ্ত,আমি সন্তুষ্ট।”